
হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৩৫২ শিশুর প্রত্যেক পরিবারকে ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের প্রত্যেক জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষাসুবিধাসহ হামের চিকিৎসায় বিশেষায়িত ইউনিট স্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়াও রিটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং আইইডিসিআর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে হাম ছাড়াও জলাতঙ্ক টিকার মজুত, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ৭ দিনের মধ্যে আদালতে হলফনামা আকারে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
রবিবার (১০ মে) সরকারের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আইইডিসিআরের পরিচালককে বিবাদী করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশনটি দায়ের করেছেন মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব, ব্যারিস্টার মোহামমদ কাউছার, মো. মাকসুদুর রহমান।
বিচারপতি রাজিক আল জলিল এবং দেবাশীষ রায় চৌধুরীর দ্বৈত বেঞ্চের অনুমতি নিয়ে রিটটি দাখিল করা হয়েছে।
রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৩৫২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সারা দেশে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি ইতোমধ্যে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। এই মৃত্যুগুলো আকস্মিক বা অনিবার্য ছিল না, বরং টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের কার্যকর ব্যবস্থার ব্যত্যয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা উপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাবের ফলেই এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
রিট পিটিশনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্তের পর দেশে হামের টিকার সরবরাহ ও টিকাদান কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ইউনিসেফ একাধিকবার সম্ভাব্য টিকা সংকট, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে সতর্ক করলেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি।
রিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আইসিইউ, পিআইসিইউ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে বহু শিশু সময়মতো চিকিৎসা পায়নি। অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেও শিশুদের জন্য আইসিইউ বা পিআইসিইউ বেড সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে একাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে।
রিটে বলা হয়েছে, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তদন্তে যাদের দায় প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
এসব বিষয়ে গত ৫ মে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু নোটিশের মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবং প্রতিদিন হাম পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জনস্বার্থে এই রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রিট আবেদনকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের, বিশেষত শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এই রিটের উদ্দেশ্য কেবল ক্ষতিপূরণ প্রার্থনা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো নাগরিককে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুর শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করা।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধান এবং জনস্বার্থের অভিভাবক হিসেবে দেশের সকল শিশু এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।