
রংপুরের ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের জন্য অপেক্ষা আর মাত্র এক মাস। স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয় এই আমটি এখন জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে এই আমকে কেন্দ্র করে রংপুর অঞ্চলে ২৫০ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আম এক বছর কম ফলন দেয়, পরের বছর আবার ভালো ফলন দেয়। যে বছর কম ফলন হয়, সেই বছরকে বলা হয় ‘অফ ইয়ার’। যে বছর ভালো ফলন দেয়, সেই বছরকে কৃষিবিদদের ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘অন ইয়ার’।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা আশা করছি, এ বছর ২৫০ কোটিরও বেশি টাকার বাণিজ্য হবে এই আমে। এবার হাঁড়িভাঙা আমের ‘অন ইয়ার’, অর্থাৎ এবার গাছে প্রচুর আম ধরেছে, যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু এই আমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পাতলা ছাল ও অত্যন্ত ছোট আঁটি। প্রতিটি আমের ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে কেবল হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১০ থেকে ১২ টন হিসেবে মোট উৎপাদন ও বাজারমূল্য ২৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, গত কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি আম বড় ও রসালো হতে বিশেষ সাহায্য করেছে। যদিও মাঝখানে কিছু এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তবে সার্বিকভাবে ফলন গত বছরের চেয়ে ভালো হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুসারে, এবার ডিসেম্বরের প্রথম দিক থেকেই গাছে আমের মুকুল আসতে শুরু করে। ফলে এ বছর ঠিক সময়ে গাছ থেকে আম পাড়া শুরু হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষিবিদ ও আমচাষিরা বলছেন, সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম বাজারে পাওয়া যাবে। এর আগে বাজারে আসা আমগুলো মূলত অপরিপক্ব থাকে। একটু বেশি দামের আশায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নিয়ম ভঙ্গ করে অপরিপক্ব আম বিক্রি করলেও প্রকৃত স্বাদ পেতে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি ও তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল ইসলাম জানান, তিনি ১২ একরের বেশি জমিতে আমের চাষ করেছেন। সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বাগানের কিছুটা ক্ষতি হলেও শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকলে আশানুরূপ ফলন পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই যোগাযোগ শুরু করেছেন। এবার আমের দাম ও চাহিদা দুটোই সন্তোষজনক হবে বলে তার প্রত্যাশা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, “হাঁড়িভাঙা আম এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই আম রপ্তানি হচ্ছে। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে ফেসবুক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের হার গত কয়েক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশাল এই বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকলেও হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব নিয়ে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। আমটি দ্রুত পচনশীল হওয়ায় পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেন বা দ্রুতগামী যানবাহনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।