রবিন চৌধুরী রাসেল, রংপুর ব্যুরো।
মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই রংপুর নগরীর বিভিন্ন বাজারে পাকা আমের ব্যাপক সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। সিটি বাজার, লালবাগ বাজার, শাপলা বাজার, সাতমাথা বাজার, মাহিগঞ্জ বাজার, চকবাজার, বাস টার্মিনাল বাজার, সিও বাজারসহ আশপাশের প্রায় সব বাজারেই এখন চোখে পড়ছে বাহারি রঙের পাকা আম। দেখতে আকর্ষণীয় ও টসটসে এসব আম ক্রেতাদের নজর কাড়লেও সময়ের আগেই বাজারে এমন আমের আধিক্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ। রংপুর মহানগরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজাতির আম—গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া আম উল্লেখ করে বিক্রি করছেন ফল ব্যবসায়ীরা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই আমের রঙ অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল, কোথাও আবার একপাশ বেশি পাকা, অন্যপাশ কাঁচা যা দেখে কৃত্রিমভাবে পাকানোর আশঙ্কা করছেন সচেতন ক্রেতারা।
সিটি বাজারে কথা হয় কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। আব্দুল করিম নামের এক ক্রেতা বলেন, এখনো আমের মৌসুম ঠিকমতো শুরু হয়নি, অথচ বাজারে এত পাকা আম! আগে এই সময় এমন দৃশ্য দেখা যেত না। বাচ্চাদের জন্য কিনতে চাই, কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে ভয় লাগে। গৃহিণী নাসিমা বেগমের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, দেখতে খুব সুন্দর লাগে, কিন্তু খেতে গেলে আগের মতো স্বাদ পাই না। অনেক সময় গন্ধও ঠিক থাকে না। মনে হয় কেমিক্যাল ও হরমোন দিয়ে পাকানো আম। আরেক ক্রেতা সাইফুল ইসলাম জানান, বাজারে ভালো ফল পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। আমরা বুঝতেই পারি না কোনটা প্রাকৃতিক আর কোনটা কৃত্রিমভাবে পাকানো। কতো টাকা কেজিতে আম বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এসব আম। বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তারা আম বিক্রি করছেন। অনেকেই দাবি করেন, তারা পাইকারি বাজার থেকে আম সংগ্রহ করেন এবং কৃত্রিমভাবে পাকানোর বিষয়টি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ সকল আম রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা,সাতক্ষীরা, মাগুড়া থেকে আসছে এসব আম। লালবাগ বাজারের এক বিক্রেতা বলেন,
আমরা যেভাবে পাইকারি বাজার থেকে আম কিনে আনি, সেভাবেই বিক্রি করি। ক্রেতারা পাকা আম চায়, তাই পাকা আমই রাখছি। হরমোন ব্যবহার হয়েছে কিনা সেটা আমাদের জানা থাকে না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রেতা স্বীকার করেন, দ্রুত বাজারে আম সরবরাহ করতে কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম উপায় ব্যবহার করে থাকেন।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আম একটি মৌসুমি ফল, যা নির্দিষ্ট সময়েই স্বাভাবিকভাবে পাকে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত লাভের আশায় হরমোন বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে আম পাকাচ্ছেন। এতে ফলের পুষ্টিগুণ কমে যায় এবং স্বাদ নষ্ট হয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদেরও সচেতন করা হচ্ছে যাতে তারা কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত না হন। এ সকল আম ক্রয়- বিক্রয় থেকে বিরত থাকেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরাও। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা: সরোয়ার জাহান বলেন, কৃত্রিমভাবে পাকানো ফলে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এসব ফল খেলে পেটের সমস্যা, বমি, ডায়রিয়া, অ্যালার্জি এমনকি দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি বিশেষভাবে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন,
ফল কেনার সময় অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙ, অস্বাভাবিক গন্ধ বা অস্বাভাবিক নরম অংশ থাকলে তা এড়িয়ে চলা উচিত। সম্ভব হলে মৌসুমি সময়েই ফল খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। বাজারে কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। একজন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। বাজারে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে এবং কেউ কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোর সঙ্গে জড়িত থাকলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনের পদক্ষেপ নয়, ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফল চেনার অভ্যাস গড়ে তোলা, অস্বাভাবিক ফল এড়িয়ে চলা এবং মৌসুম অনুযায়ী ফল খাওয়ার প্রবণতা বাড়ালে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সব মিলিয়ে, মৌসুমের আগেই রংপুরের বাজারে পাকা আমের এই ছড়াছড়ি যেমন একদিকে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে, অন্যদিকে কৃত্রিমতার শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর নজরদারি ও জনসচেতনতার মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।